
শহীদুল ইসলাম শহীদ, রংপুর প্রতিনিধি :
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা ইউনিয়ন পরিষদের ৯নং ওয়ার্ড সদস্য ঝর্ণা বেগমকে ভিজিএফ চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। উচ্চতর তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯–এর ৩৪(৪)(খ) ও (ঘ) ধারা অনুযায়ী তাকে বরখাস্তের আদেশ জারি করা হয়। একই সঙ্গে অস্থায়ীভাবে ওই ওয়ার্ডের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সংরক্ষিত ৭,৮,৯ মহিলা সদস্য শম্পা বেগমকে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দরিদ্র ও দুস্থ পরিবারের জন্য ১০ কেজি করে ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। গজঘণ্টা ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডে রেশিও অনুযায়ী ৪৮৬টি স্লিপ ইউপি সদস্য ঝর্ণা বেগমের কাছে হস্তান্তর করেন প্যানেল চেয়ারম্যান বকুল মিয়া। অভিযোগ ওঠে—তিনি বেশ কয়েকজন উপকারভোগীকে স্লিপ না দিয়েও তাদের নামে চাল উঠিয়ে আত্মসাৎ করেন।
প্রতিবন্ধী নাজমুল ইসলাম, বিধবা রওশন আরা, শাহানা, ছাবেরা, রোকসানা, জিরামনি, আয়ুব আলীসহ বহু ভুক্তভোগী জানান, তালিকায় নাম থাকলেও তারা স্লিপ পাননি। ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে তারা জানতে পারেন—তাদের নামে চাল উত্তোলন দেখানো হয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, পূর্বে ভাতা, রেশন কার্ড ও ৪০ দিনের কর্মসূচির কাজ দেওয়ার নামেও ঝর্ণা বেগম টাকা নিয়েছেন।
অভিযোগের ভিত্তিতে প্রথমে উপজেলা প্রশাসন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে এই তদন্তে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ ছিল, কমিটি যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করেই তড়িঘড়ি করে প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা পুনঃতদন্তের জন্য আবেদন করলে ইউএনও নতুন করে উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
উচ্চতর কমিটি ভুক্তভোগীদের লিখিত ও ভিডিও জবানবন্দী, ইউপি চেয়ারম্যানের লিখিত ব্যাখ্যা, সংরক্ষিত ৭,৮,৯ মহিলা সদস্যের লিখিত ব্যাখ্যা সহ সংশ্লিষ্ঠ ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশের বক্তব্য গ্রহণ করেন। এতে উঠে আসে—
ঝর্ণা বেগম প্রথম জবাবে দাবি করেন, গ্রাম পুলিশকে সঙ্গে নিয়েই স্লিপ বিতরণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় জবাবে তিনি জানান, ৩০টি স্লিপ সংরক্ষিত ৭,৮,৯ মহিলা সদস্য শম্পা বেগমকে দিয়েছেন। কিন্তু গ্রাম পুলিশ ও সংরক্ষিত মহিলা সদস্যা শম্পা বেগম লিখিতভাবে জানান, ঝর্ণা বেগম নিজের অপকর্ম ঢাকার জন্য এসব দাবি মিথ্যা ও বানোয়াট। তারা স্লিপ বিতরণের বিষয়ে কোনো তথ্যই জানতেন না।
তাদের জবানবন্দী ঝর্ণা বেগমের বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হওয়ায় রিপোর্টে অনিয়ম নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
উল্লেখ্য, ঝর্ণা বেগমের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। ২০২২ ও ২০২৩ সালে রেশন কার্ড, ভাতা এবং সরকারি বরাদ্দ আত্মসাত–সংক্রান্ত অভিযোগ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ পায়। এসব অভিযোগের লিখিত নথিও ইউএনও কার্যালয়ে সংরক্ষিত রয়েছে। ভুক্তভোগীরা দাবি করেন—তখন প্রভাবশালী মহলের চাপ ও মামলার ভয় দেখিয়ে অভিযোগকারীদের অনেককে অভিযোগ প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়েছিল।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন,গজঘণ্টা ইউনিয়ন পরিষদ ৯(নয়)ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ঝর্ণা বেগম সাময়িক বরখাস্ত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সংরক্ষিত ৭,৮,৯ নং ওয়ার্ডের সদস্য শম্পা বেগমকে সকল প্রকার কাজের দায়িত্ব পালনের জন্য চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি—বছরের পর বছর সরকারি বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তারা। এবার তদন্ত ও বরখাস্তের সিদ্ধান্তে তারা স্বস্তি প্রকাশ করলেও, শুধু বরখাস্ত নয়, ঝর্ণা বেগমের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এবং আত্মসাৎ করা সুবিধার পুনরুদ্ধার দাবি করেছেন।
